আল-কুরআনের আলোকে সহযোগীতা ও প্রতিযোগিতা
১. সৎ কাজ বা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করার নির্দেশ প্রদান করে। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ وَلِكُلࣲّ وِجۡهَةٌ هُوَ مُوَلِّیهَاۖ فَٱسۡتَبِقُوا۟ ٱلۡخَیۡرَ ٰتِۚ أَیۡنَ مَا تَكُونُوا۟ یَأۡتِ بِكُمُ ٱللَّهُ جَمِیعًاۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَیۡءࣲ قَدِیرࣱ }
“আর প্রত্যেকের রয়েছে একটি দিক, যেদিকে সে চেহারা ফিরায়। সুতরাং তোমরা কল্যাণকর্মে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সবাইকে নিয়ে আসবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা আল বাক্বারা ২:১৪৮)
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,
{ لِكُلࣲّ جَعَلۡنَا مِنكُمۡ شِرۡعَةࣰ وَمِنۡهَاجࣰاۚ وَلَوۡ شَاۤءَ ٱللَّهُ لَجَعَلَكُمۡ أُمَّةࣰ وَ ٰحِدَةࣰ وَلَـٰكِن لِّیَبۡلُوَكُمۡ فِی مَاۤ ءَاتَىٰكُمۡۖ فَٱسۡتَبِقُوا۟ ٱلۡخَیۡرَ ٰتِۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُكُمۡ جَمِیعࣰا فَیُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِیهِ تَخۡتَلِفُونَ }
“তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরীআত ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।” (সূরা আল মায়িদা ৫:৪৮)
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! যেহেতু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সৎকাজ বা ভালো কাজের প্রতিযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন তাই আমাদের উচিত নয় কি সৎকাজ বা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে সৎকাজ বা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করার তৌফিক দান করুন। আমিন!
২. আসুন এখন আমরা জেনে নেই যে, আমরা সৎ কাজ কেন করব বা সৎ কাজের প্রতিযোগিতা কেন করব? নিম্নে সৎ কাজের প্রতিযোগিতা করার কয়েকটি কারণে উপস্থাপন করা হলো।
আল্লাহর নির্দেশ পালন। নির্দেশ পালন করা আমাদের জন্য ফরজ বা আবশ্য। (উপরোক্ত আয়াত দুটি ভালো করে দেখুন)
আখেরাতে জান্নাত লাভের আশায়। পবিত্র কুরআনে অসংখ্য জায়গায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ঈমান ও সৎকাজের মাধ্যমে জান্নাত হাসিল বা আল্লাহর ঘোষিত মহাপুরস্কারের অর্জন করা যাবে। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ فَأَمَّا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ فَیُوَفِّیهِمۡ أُجُورَهُمۡ وَیَزِیدُهُم مِّن فَضۡلِهِۦۖ }
“পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তিনি তাদেরকে তাদের পুরষ্কার পরিপূর্ণ দেবেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তাদেরকে বাড়িয়ে দেবেন।” (সূরা আন নিসা ৪:১৭৩)
জান্নাতের নাজ-নিআমত প্রাপ্তির আশায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
{ یُسۡقَوۡنَ مِن رَّحِیقࣲ مَّخۡتُومٍ (25) خِتَـٰمُهُۥ مِسۡكࣱۚ وَفِی ذَ ٰلِكَ فَلۡیَتَنَافَسِ ٱلۡمُتَنَـٰفِسُونَ (26) }
“তাদেরকে সীলমোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিসক। আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। (সূরা আল মুতফফিফীন ৮৬:২৫-২৬)
আল্লাহর আজাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য। কেননা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
{وَأَمَّا ٱلَّذِینَ ٱسۡتَنكَفُوا۟ وَٱسۡتَكۡبَرُوا۟ فَیُعَذِّبُهُمۡ عَذَابًا أَلِیمࣰا وَلَا یَجِدُونَ لَهُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَلِیࣰّا وَلَا نَصِیرࣰا }
“আর যারা হেয় জ্ঞান করেছে এবং অহঙ্কার করেছে, তিনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তারা তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা আন নিসা ৪:১৭৩)
ক্ষতিগ্রস্ততার অন্তর্ভুক্ত হাওয়া থেকে বাঁচার জন্য। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
{ وَٱلۡعَصۡرِ (1) إِنَّ ٱلۡإِنسَـٰنَ لَفِی خُسۡرٍ (2) إِلَّا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ وَتَوَاصَوۡا۟ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡا۟ بِٱلصَّبۡرِ (3) }
“সময়ের কসম, নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত।তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।” (সূরা আল আছর ১০৩:১-৩)
দুনিয়াতে কল্যাণ লাভের আশায়। সৎকাজের প্রতিযোগিতা করায় জাকারিয়া (আঃ) কে তার পুত্র ইয়াহইয়া (আঃ) এর সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। সৎকাজে প্রতিযোগিতা করলে পুরস্কার প্রাপ্ত হওয়া যায়। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
{ فَٱسۡتَجَبۡنَا لَهُۥ وَوَهَبۡنَا لَهُۥ یَحۡیَىٰ وَأَصۡلَحۡنَا لَهُۥ زَوۡجَهُۥۤۚ إِنَّهُمۡ كَانُوا۟ یُسَـٰرِعُونَ فِی ٱلۡخَیۡرَ ٰتِ وَیَدۡعُونَنَا رَغَبࣰا وَرَهَبࣰاۖ وَكَانُوا۟ لَنَا خَـٰشِعِینَ }
“অতঃপর আমি তার আহবানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া। আর তার জন্য তার স্ত্রীকে উপযোগী করেছিলাম। তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৯০)
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! এত সময় আমরা আলোচনা করেছি কোন বিষয় প্রতিযোগিতা করা যাবে এবং আমরা কেন প্রতিযোগিতা করব। এখন আমরা দেখব কোন বিষয় প্রতিযোগিতা করা যাবে না।
১. দুনিয়ার জীবনের ভোগ উপকরণ ও পারস্পরিক আধিক্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। যেমন মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ ٱعۡلَمُوۤا۟ أَنَّمَا ٱلۡحَیَوٰةُ ٱلدُّنۡیَا لَعِبࣱ وَلَهۡوࣱ وَزِینَةࣱ وَتَفَاخُرُۢ بَیۡنَكُمۡ وَتَكَاثُرࣱ فِی ٱلۡأَمۡوَ ٰلِ وَٱلۡأَوۡلَـٰدِۖ كَمَثَلِ غَیۡثٍ أَعۡجَبَ ٱلۡكُفَّارَ نَبَاتُهُۥ ثُمَّ یَهِیجُ فَتَرَىٰهُ مُصۡفَرࣰّا ثُمَّ یَكُونُ حُطَـٰمࣰاۖ وَفِی ٱلۡـَٔاخِرَةِ عَذَابࣱ شَدِیدࣱ وَمَغۡفِرَةࣱ مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَ ٰنࣱۚ وَمَا ٱلۡحَیَوٰةُ ٱلدُّنۡیَاۤ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلۡغُرُورِ }
“তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা আল হাদীদ ৫৭:২০)
২. দুনিয়ার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, অহংকার-আধিক্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতার আসন, আমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করেছে বা আমাদেরকে আল্লাহর থেকে বহু দূরে নিয়ে গেছে। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ أَلۡهَىٰكُمُ ٱلتَّكَاثُرُ (1) حَتَّىٰ زُرۡتُمُ ٱلۡمَقَابِرَ (2) }
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে রেখেছে।যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ করবে।” (সূরা আত তাকাসূর ১০২:১-২)
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! আল্লাহ তা’আলা যেন আমাদের সকলকে কবরের মাটি মুখে যাওয়ার পূর্বেই সঠিক বুঝ দান করেন এবং সৎ কাজের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উত্তম পুরস্কার হাসিল করার তৌফিক দান করেন। আমিন!
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! আমরা কেউ দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের আবাসস্থল বা বাসস্থান জাহান্নামে করে নিতে অবশ্যই যাবো না। কেননা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
{ فَأَمَّا مَن طَغَىٰ (37) وَءَاثَرَ ٱلۡحَیَوٰةَ ٱلدُّنۡیَا (38) فَإِنَّ ٱلۡجَحِیمَ هِیَ ٱلۡمَأۡوَىٰ (39) }
“সুতরাং যে সীমালংঘন করেছে, আর দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে, নিশ্চয় জাহান্নাম হবে তার আবাসস্থল।” (সূরা আন নাযি’আত ৭৯:৩৭-৩৯)
তাই দুনিয়াবী কোন বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা না করে আখিরাতের বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা করা আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য । কারণ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরের আয়াতেই জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَأَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ وَنَهَى ٱلنَّفۡسَ عَنِ ٱلۡهَوَىٰ (40) فَإِنَّ ٱلۡجَنَّةَ هِیَ ٱلۡمَأۡوَىٰ (41) }
“আর যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল।” (সূরা আন নাযি’আত ৭৯:৪০-৪১)
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! আমরা যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব। তাই আমরা একে অপরের সহযোগিতা নিয়েই জীবন অতিবাহিত করে থাকি। আর আমরা জীবন অতিবাহিত করতে গিয়ে কোন না কোন সহযোগিতা করি। তা ভালো কাজই হোক অথবা মন্দ কাজই হোক। চলুন দেখি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোন কাজে সহযোগিতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
১. তোমরা পরস্পরকে সৎকাজ ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা কর। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
{ وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَ ٰنِۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِیدُ ٱلۡعِقَابِ }
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর।” (সূরা আল মায়িদা ৫:২)
২. দ্বীনের ব্যাপারে কেউ সহযোগিতা চাইলে তাকে সহযোগিতা করা মু’মিনের কর্তব। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ وَإِنِ ٱسۡتَنصَرُوكُمۡ فِی ٱلدِّینِ فَعَلَیۡكُمُ ٱلنَّصۡرُ }
“আর যদি তারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট কোন সহযোগিতা চায়, তাহলে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য।” (সূরা আনফাল ৮:৭২)
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ! আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে পবিত্র কুরআনের আলোকে প্রতিযোগিতা করা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা ও কোন কাজে সহযোগিতা করা যাবে এবং কোন কাজে সহযোগিতা করা যাবে না এ বিষয়টি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। আমার উপস্থাপনার ভুলত্রুটি থেকে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
{ إِنۡ أُرِیدُ إِلَّا ٱلۡإِصۡلَـٰحَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُۚ وَمَا تَوۡفِیقِیۤ إِلَّا بِٱللَّهِۚ عَلَیۡهِ تَوَكَّلۡتُ وَإِلَیۡهِ أُنِیبُ }
